যুদ্ধ নয়, শান্তিও নয়—এমন পরিস্থিতির অবসান চান পেজেশকিয়ান; হরমুজ প্রণালি ও মার্কিন অবরোধ নিয়ে ইরানের প্রস্তাব ঘিরে ভিন্ন তথ্য
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা নতুন করে বাড়ছে। একদিকে ইরানে সম্ভাব্য মার্কিন হামলার আশঙ্কা, অন্যদিকে তেহরানের সঙ্গে বড় কোনো চুক্তিতে পৌঁছানোর সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছেন না মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এমন পরিস্থিতিতে দেশের চলমান ‘যুদ্ধও নয়, শান্তিও নয়’ অবস্থার অবসান চেয়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। তিনি জানিয়েছেন, অর্থনৈতিক সংকটের কারণে দেশটির অনেক নাগরিকের পক্ষে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাবার কেনাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
শনিবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, ইরানে সম্ভাব্য হামলা কখন চালানো হতে পারে, সে বিষয়ে তিনি আগাম কিছু জানাতে চান না। একই সঙ্গে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিতে সম্মত হবে কি না, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা প্রকাশ করেন তিনি। তবে পরিস্থিতির শেষ পরিণতিতে যুক্তরাষ্ট্রই জয়ী হবে বলে দাবি করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
ট্রাম্পের বক্তব্যে একদিকে সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনা, অন্যদিকে কূটনৈতিক সমঝোতার পথ খোলা রাখার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে দুই দেশের মধ্যে চূড়ান্ত কোনো চুক্তি হবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত।
অর্থনৈতিক সংকটে চাপে ইরান
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান দেশের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতির অবসান চেয়েছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের আশঙ্কা এবং অর্থনৈতিক চাপ সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলেছে।
বিশেষ করে খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনার ক্ষেত্রেও অনেক নাগরিককে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।
যুদ্ধের প্রভাব, ইরানের তেল রপ্তানিতে বিধিনিষেধ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাধার কারণে দেশটির অর্থনীতি তীব্র চাপের মুখে রয়েছে। এ অবস্থায় সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে প্রস্তাব, প্রতিবেদনে ভিন্নতা
সৌদি সংবাদমাধ্যম আল আরাবিয়ার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে একটি প্রস্তাব পাঠিয়েছে ইরান। এতে ইরানের বন্দরগুলোতে মার্কিন অবরোধ তুলে নেওয়ার বিনিময়ে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
পাশাপাশি ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনা শুরুর আগ্রহও প্রকাশ করেছে তেহরান বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
তবে এ বিষয়ে ভিন্ন তথ্য দিয়েছে ইরানের আধা-সরকারি সংবাদমাধ্যম তাসনিম নিউজ এজেন্সি। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারীর কাছে নতুন কোনো প্রস্তাব দেওয়ার খবর অস্বীকার করেছে তেহরানের একটি সূত্র।
ওই সূত্রের দাবি, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিনিময়ে মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহারের প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান।
মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে আগে জানানো সাতটি শর্তেই নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে দেশটি।
ফলে ইরান সত্যিই নতুন কোনো সমঝোতার প্রস্তাব দিয়েছে কি না, তা নিয়ে দুই সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে স্পষ্ট মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে।
আলোচনায় পাকিস্তান ও কাতারের ভূমিকা
এর আগে জুনে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করা, ইরানের ওপর মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার এবং দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বৃহত্তর চুক্তির আলোচনা শুরুর লক্ষ্যে একটি অন্তর্বর্তী সমঝোতার উদ্যোগে পাকিস্তান ও কাতার মধ্যস্থতা করেছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নৌপথ। এ পথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাজারে এর প্রভাব পড়তে পারে। তাই প্রণালিটি ঘিরে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধ আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
কোন পথে এগোবে পরিস্থিতি?
সর্বশেষ পরিস্থিতিতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সামনে দুটি সম্ভাবনা রয়েছে—একদিকে সামরিক সংঘাত আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা, অন্যদিকে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছানোর সুযোগ। ট্রাম্পের বক্তব্যে সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনা উড়িয়ে না দিলেও চুক্তির পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে, ইরানের পক্ষ থেকে নতুন প্রস্তাব পাঠানোর খবর নিয়ে পরস্পরবিরোধী প্রতিবেদন পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। দুই দেশের মধ্যে আলোচনা আদৌ শুরু হবে কি না, সম্ভাব্য হামলা এড়ানো সম্ভব হবে কি না এবং অর্থনৈতিক অবরোধ নিয়ে কোনো সমাধান আসবে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি।
সব মিলিয়ে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার পরবর্তী গতিপথ নির্ভর করছে দুই দেশের সিদ্ধান্ত, কূটনৈতিক তৎপরতা এবং সম্ভাব্য মধ্যস্থতার ওপর।









