শার্শা প্রতিনিধি | আলমগীর হোসেন;
একদিকে নতুন প্রাণের আগমন, অন্যদিকে চিরবিদায়ের কান্না। যে সন্তানকে ঘিরে ছিল একটি দম্পতির হাজারো স্বপ্ন, সেই সন্তানের পৃথিবীতে আসার মাত্র ১৫ মিনিট আগেই না-ফেরার দেশে চলে গেলেন বাবা হাবিবুর রহমান।
বাবার মুখ দেখার আগেই পৃথিবীতে এলো তাঁর পুত্রসন্তান।
ঘটনাটি ঘটেছে যশোরের শার্শা উপজেলার উলাশি ইউনিয়নে বেনেখড়ি গ্রামে এই মর্মান্তিক ঘটনা স্বজন ও এলাকাবাসীর হৃদয় ছুঁয়ে গেছে।
হাবিবুর রহমান উলাশি ইউনিয়নের হযরত আলীর ছেলে। প্রায় দুই বছর আগে মিমের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। তাঁদের ছোট্ট সংসারে আসছিল নতুন অতিথি। সন্তান জন্মের সম্ভাব্য তারিখ ছিল আরও ১৫ দিন পর।
অনাগত সন্তানকে ঘিরে স্বামী-স্ত্রীর কত পরিকল্পনা, কত স্বপ্ন! এমনকি সন্তান জন্মের পর আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীকে আনন্দ করে খাওয়ানোর জন্য ব্যাংকে জমা রেখেছিলেন ৩৫ হাজার টাকা।
কিন্তু কে জানত, সেই আনন্দের প্রস্তুতি একদিন এমন বিষাদে ডুবে যাবে!
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় এক সপ্তাহ আগে হঠাৎ ভোরে অসুস্থ হয়ে পড়েন হাবিবুর।
চিকিৎসকের পরামর্শে প্রথমে বাগআঁচড়া হাসপাতালে, পরে যশোর হাসপাতালে নেওয়া হয় তাঁকে। অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়া হয়। সেখানে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করেও শেষ পর্যন্ত বাঁচানো যায়নি তাঁকে। গত রোববার ঢাকার একটি হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়।
সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে এরপর। স্বামীর মৃত্যুর খবরের শোক আর অনাগত সন্তানকে পৃথিবীতে আনার অপেক্ষার মধ্যে মিমকে নেওয়া হয় বাগআঁচড়া হাসপাতালে। স্বামীর মৃত্যুর প্রায় ১৫ মিনিট পর সেখানে পুত্রসন্তানের জন্ম দেন তিনি।
যে সন্তানকে কোলে নিয়ে আনন্দে ভাসার কথা ছিল হাবিবুরের, সেই সন্তান পৃথিবীতে এলো বাবার চিরবিদায়ের ঠিক পরমুহূর্তে। একদিকে নবজাতকের কান্না, অন্যদিকে স্বজনদের আহাজারি—এক পরিবারের জীবনে নেমে আসে অবর্ণনীয় শোক।
সন্তান জন্মের পর আত্মীয়স্বজনকে খাওয়ানোর জন্য জমানো ৩৫ হাজার টাকা যেন হয়ে রইল অপূর্ণ স্বপ্নের এক নীরব সাক্ষী। যে ঘরে নতুন অতিথির আগমন উপলক্ষে আনন্দের প্রস্তুতি চলার কথা, সেই ঘরেই ফিরে আসে বাবার নিথর দেহ। বাবার কাঁধে ছেলের লাশ—এ দৃশ্য কোনো বাবার জীবনে যেন না আসে। হাবিবুরের নিজের বাবাই ছেলের জানাজা নামাজ পড়ান।
জানাজায় অংশ নেন হাজারো মানুষ। পরে তাঁকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয় বলে স্বজনদের সূত্রে জানা গেছে।
হাবিবুরের রেখে যাওয়া নবজাতক সন্তান এখনো জানে না, পৃথিবীতে আসার আগেই সে হারিয়েছে তার বাবাকে। আর স্ত্রী মিমের সামনে পড়ে রইল এক কঠিন বাস্তবতা—স্বামীহারা জীবনের শোক বুকে নিয়ে নবজাতককে বড় করে তোলার সংগ্রাম।
কিছু বিদায় শুধু একজন মানুষকে কেড়ে নেয় না, ভেঙে দেয় একটি পরিবারের সাজানো স্বপ্নও। হাবিবুর রহমানের মৃত্যু আর তাঁর মৃত্যুর ১৫ মিনিট পর পুত্রসন্তানের জন্ম—এই ঘটনা যেন সুখ-দুঃখের নির্মম এক গল্প, যার প্রতিটি অধ্যায়ে মিশে আছে অশ্রু, ভালোবাসা আর অপূর্ণতার বেদনা।









