আমদানি, বাজারজাতকরণ ও ব্যবহারে নীতিমালা পর্যালোচনা; কৃষক-ভোক্তার স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপের ঘোষণা
নিজস্ব প্রতিবেদক:
জনগণের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত খাদ্য নিশ্চিত করতে কীটনাশকের আমদানি, বাজারজাতকরণ ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে সরকার কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে বলে জানিয়েছেন কৃষি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ।
রোববার (২৫ অক্টোবর) রাজধানীর ইনডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ-এর মিলনায়তনে বাংলাদেশ সোসাইটি ফর সেফ ফুড আয়োজিত এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
মন্ত্রী বলেন, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিত করতে কীটনাশকের যথাযথ নিয়ন্ত্রণ অপরিহার্য। দেশে এমন অনেক কীটনাশক আমদানি ও বাজারজাত করা হচ্ছে, যেগুলো বিশ্বের বহু দেশে ব্যবহার করা হয় না। এ পরিস্থিতিতে কীটনাশক আমদানির বিদ্যমান নীতিমালা ও পরীক্ষাব্যবস্থা পর্যালোচনা করে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হবে।
তিনি বলেন, শুধু খাদ্যের উৎপাদন বাড়ালেই হবে না; উৎপাদিত খাদ্য নিরাপদ, পুষ্টিকর ও মানসম্মত কি না, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। খাদ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিপণন পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে গুণগত মান বজায় রাখা জরুরি।
কীটনাশকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে স্বাস্থ্যঝুঁকি
কৃষক ও ভোক্তার স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টি তুলে ধরে কৃষিমন্ত্রী বলেন, কীটনাশকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার উদ্বেগজনক। খাদ্যে কীটনাশকের ক্ষতিকর অবশিষ্টাংশ থেকে গেলে তা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এ কারণে কীটনাশক আমদানি ও ব্যবহারের নীতিমালা পর্যালোচনায় সরকার ইতোমধ্যে একাধিক কমিটি গঠন করেছে বলে জানান তিনি। সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানী, বিশেষজ্ঞ, আমদানিকারক ও অন্যান্য অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করে এ বিষয়ে কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
মন্ত্রী আরও বলেন, প্রয়োজনীয় কারিগরি জ্ঞান ও প্রশিক্ষণের অভাবে অনেক কৃষক কীটনাশক এবং রাসায়নিক সার ব্যবহারে সঠিক মাত্রা অনুসরণ করতে পারেন না। এ সমস্যা সমাধানে কৃষকদের সচেতনতা বৃদ্ধি, প্রশিক্ষণ এবং নিরাপদ উৎপাদন পদ্ধতির সম্প্রসারণে সরকার কাজ করছে। পাশাপাশি কৃষিকে লাভজনক পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে কৃষি উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সুষম সার ব্যবহার ও উত্তম কৃষিচর্চার ওপর গুরুত্ব
রাসায়নিক সারের অতিরিক্ত ব্যবহারে মাটির স্বাস্থ্য ও পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, জমির প্রয়োজন অনুযায়ী সুষম সার প্রয়োগ এবং উত্তম কৃষিচর্চা অনুসরণ করতে হবে। একই সঙ্গে কীটনাশক ও কৃষি উপকরণ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে মানসম্মত পণ্য উৎপাদন এবং প্রযোজ্য বিধিবিধান ও মানদণ্ড মেনে চলতে হবে।
পোলট্রি খাতের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, মুরগির খাদ্যে অ্যান্টিবায়োটিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়েও কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন। নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকারের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও উদ্যোক্তাদেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
কৃষিপণ্য রপ্তানিতে মানোন্নয়নের তাগিদ
বাংলাদেশের কৃষিপণ্যের আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে কৃষিমন্ত্রী বলেন, দেশের কৃষিপণ্য বিদেশে রপ্তানির যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। তবে রপ্তানিতে প্রকৃত সাফল্য অর্জন করতে হলে প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাশাপাশি বিদেশি ভোক্তাদের কাছেও এসব পণ্য পৌঁছে দিতে হবে।
এ লক্ষ্যে কাঁঠাল, আনারসসহ সম্ভাবনাময় কৃষিপণ্যের মানোন্নয়ন ও রপ্তানি সম্প্রসারণে কাজ চলছে বলে জানান তিনি।
মন্ত্রী বলেন, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা শুধু সরকারের একার দায়িত্ব নয়। কৃষক, উদ্যোক্তা, বিজ্ঞানী, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী ও ভোক্তাসহ সবাইকে সচেতন ও দায়িত্বশীল হতে হবে। সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।
সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন যারা
বাংলাদেশ সোসাইটি ফর সেফ ফুডের সেমিনার আয়োজক কমিটির আহ্বায়ক ড. মোহাম্মদ রফিকুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ও আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইনডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশের উপাচার্য অধ্যাপক ড. ম. তামিম, জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আমির হোসেন, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো. শফিকুল ইসলাম, মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. খালেদ কনক এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্ভিদ সংরক্ষণ উইংয়ের পরিচালক ড. মোহাম্মদ এনায়েত-ই-রাব্বি।
সেমিনারে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, কীটনাশকের যথাযথ ব্যবহার, কৃষিপণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।









